দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। ভারত চাইছে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানকে দিল্লিতে স্বাগত জানাতে। কিন্তু ঢাকার অবস্থান এখনো স্পষ্ট—সফর নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে প্রয়োজন ‘অনুকূল পরিবেশ’।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একটি ই-মেইল নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি ভবনে সাপ্তাহিক প্রহরী বদলের অনুষ্ঠান বাতিলের কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে তখন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর থেকেই সম্ভাব্য সফর নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ পরে স্পষ্ট করে বলেন, ‘সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বড় জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তার প্রথম ভারত সফর। ফলে এই সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কোন পথে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
কারণ গত দুই বছরে দুই দেশের সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান। এরপর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার অবস্থান সেই উদ্যোগকে জটিল করে তুলছে। ঢাকা তাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। এদিকে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের আবেদনটি বিবেচনাধীন রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
এএএম সালেহ বলেন, ‘অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অমীমাংসিত থাকলেও নতুন সরকারের প্রতি একাধিকবার আগ্রহ দেখিয়েছে দিল্লি। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীসহ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ দেওয়া হবে এবং ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম সারনের মতে, দিল্লিতে এ নিয়ে কিছুটা হতাশা রয়েছে। কারণ শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত এরই মধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের জরুরি কিছু চাহিদা মেটাতে ভারতের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা ভিসা দেওয়া রয়েছে। বাণিজ্য সহজ করতে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরায় চালু হয়েছে।
দুই দেশের জন্যই সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি, যার বড় অংশই ভারতের অনুকূলে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে। তবে এর আগে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান সেই উত্তেজনা এখনো জিইয়ে রেখেছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের মাটিতে হাসিনাকে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকা।
এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্যের প্রতি তারা সমর্থন জানায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের আগে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার খবর ছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।’
তারেক রহমানের জন্য তাই হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় দিল্লি সফর করা দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের আগ্রহ শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়। তার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করেছে।
ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয় দিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে এ মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিও বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের আগ্রহ তৈরি করেছে। চুক্তিটির বিস্তারিত এবং সদস্যদের ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি উত্তর আটলান্টিক জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতির আদলে করা হয়েছে।
বাংলাদেশের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানান।
দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সৌদি আরবও। তবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের সতর্কতার সঙ্গে এগোনো উচিত। তার ভাষায়, শুধু ভারতকে বিরক্ত করার বিষয় হিসেবে না দেখে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং তা বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না, তা দেখার জন্য সময় নেওয়া প্রয়োজন।
এসব পরিবর্তন ভারতের জন্যও একটি বার্তা—বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলাচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, সেটি ভবিষ্যতেও একইভাবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের সরকারেরও দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তার বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত। তার ভাষায়, ‘প্রতিবেশীদের একসঙ্গেই থাকতে হয়।’
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারতের আয়োজনে একটি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর এখন শুধু একটি কূটনৈতিক সফরের সম্ভাবনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ। তবে সফর হবে কি না, হলে কখন হবে—এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
/অ